প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ
পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও সামরিক উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়ে জাপান সাগরে একটি নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ উত্তর কোরিয়া। জাপানের সাম্প্রতিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জোরালো ঘোষণা এবং প্রতিরক্ষামূলক নীতির কঠোর সমালোচনা করার মাত্র একদিনের মাথায় পিয়ংইয়ং এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করল। বৃহস্পতিবার (০৬ আগস্ট) দক্ষিণ কোরিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর বরাতে ফরাসি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। পিয়ংইয়ংয়ের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন, সিউল ও টোকিওর মধ্যে নিরাপত্তাজনিত নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
জাপানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ও কিম বোনের হুঁশিয়ারি
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সাল থেকেই উত্তর কোরিয়া নিজেকে একটি স্থায়ী এবং অপরিবর্তনীয় পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করে আসছে। সম্প্রতি জাপান সরকারের বার্ষিক প্রতিরক্ষা পর্যালোচনায় উত্তর কোরিয়ার ক্রমাগত পরমাণু ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতাকে পূর্ব এশিয়ার জন্য এক চরম ও ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে চলতি সপ্তাহেই জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংকট সামাল দিতে জাপানের নিজস্ব সামরিক শক্তি বহুগুণে শক্তিশালী করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন: শেখ হাসিনার দেশত্যাগের গোপন রেসকিউ মিশনের আদ্যোপান্ত ফাঁস
জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর উক্ত বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় উত্তর কোরিয়া। বুধবার দেশটির কেসিএনএ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক কড়া বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন ও শীর্ষ নীতি নির্ধারক কিম ইয়ো জং হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, জাপানের এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির তোড়জোড়ের জবাবে পিয়ংইয়ংয়ের নেতৃত্ব অচিরেই আরও অতিরিক্ত ও কঠোর সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এই হুমকি দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সমুদ্র অভিমুখে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে নিজেদের সামরিক শক্তির জানান দিল কিম প্রশাসন।
ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও যৌথ পর্যবেক্ষণ
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ (জেসিএস) এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টার দিকে উত্তর কোরিয়ার উপকূলীয় ওনসান এলাকা থেকে একটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উড্ডয়ন করতে দেখা যায়। ক্ষেপণাস্ত্রটি তীব্র গতিতে পূর্ব সাগরের দিকে (যা বিশ্বজুড়ে জাপান সাগর নামেও পরিচিত) ধাবিত হয় এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করে সমুদ্রে পতিত হয়। এই ঘটনা জানার পরপরই সিউল এবং ওয়াশিংটনের যৌথ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ক্ষেপণাস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট ধরন, গতিপথ এবং ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ শুরু করেছে।
আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালি চুক্তি আসায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় পতন
এদিকে ঘটনার পরপরই জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক জরুরি বার্তায় জানায়, উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ড থেকে একটি সম্ভাব্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে জাপানের সামুদ্রিক ও উপকূলীয় এলাকায় কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কিংবা প্রভাব পড়েনি বলে নিশ্চিত করে টোকিও প্রশাসন। তবুও টোকিও ও সিউল যৌথভাবে উত্তর কোরিয়ার প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপের ওপর সার্বক্ষণিক কড়া নজরদারি বজায় রাখছে।
আসন্ন যৌথ সামরিক মহড়া ও সিউলের সতর্কবার্তা
চলতি মাসের শেষভাগে দক্ষিণ কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বহুল আলোচিত বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া 'উলচি ফ্রিডম শিল্ড' আয়োজন করতে যাচ্ছে। পারমাণবিক সামর্থ্যসম্পন্ন উত্তর কোরিয়াকে কূটনৈতিক ও সামরিক চাপে রাখতেই প্রধানত এই যৌথ প্রতিরক্ষা মহড়ার আয়োজন করা হয়ে থাকে। তবে উত্তর কোরিয়া প্রতি বছরই এই ধরণের যৌথ মহড়ার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে এবং এগুলোকে তাদের ওপর সরাসরি সামরিক আক্রমণের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে অভিহিত করে থাকে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জেসিএস স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত মিত্রতা জোরদার করে তারা যেকোনো ধরনের সামরিক উস্কানির তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি সিউল, ওয়াশিংটন ও টোকিও তিন মিত্র দেশই নিয়মিত বার্তা ও তথ্য আদান-প্রদান করছে। উত্তর কোরিয়ার এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সমগ্র এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিরক্ষা নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি ও দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ (জেসিএস)।
