প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ
ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটে নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। কীভাবে এবং কাদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও অতি গোপনীয় রেসকিউ মিশন পরিচালনা করা হয়েছিল, কোন কর্মকর্তা এবং বিশেষ উড্ডয়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে তাকে দেশের মাটি থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল—সেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবার বিভিন্ন সাবেক ও বর্তমান সামরিক সূত্রের বরাতে উন্মোচিত হয়েছে। যদিও সার্বিক ঘটনার বিষয়ে সশস্ত্র বাহিনী কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি, তবুও এই উদ্ধার অভিযানের নিখুঁত বিস্তারিত তথ্য রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
গণভবন থেকে কুর্মিটোলা: রেসকিউ মিশনের প্রথম পর্যায়
গত ৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে দেশের ইতিহাসের এক নজিরবিহীন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে বাংলাদেশ। চারদিক থেকে লাখ লাখ বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার জনস্রোত রাজধানীর বুকে প্রবেশ করতে শুরু করে। একপর্যায়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বাধা ও গুলি উপেক্ষা করে গণভবনের দিকে হাজার হাজার মানুষ ধেয়ে আসলে চরম নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মাত্র ৩০ মিনিট সময় বেঁধে দিয়ে গণভবন ছাড়ার তাগিদ দেন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অতি দ্রুত বাণিজ্যমেলার কাছাকাছি স্থানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ হেলিকপটার (এমআই-১৭) এসে অবতরণ করে। সেখান থেকে শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে তুলে নিয়ে উড্ডয়ন করে হেলিকপটারটি।
আরও পড়ুন: ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করল নির্বাচন কমিশন
সংশ্লিষ্ট সামরিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সংকটময় মুহূর্তে হেলিকপটারটি অত্যন্ত সাহসিকতা ও দক্ষতার সাথে চালনা করেছিলেন পাইলট এয়ার কমোডর আব্বাস এবং কো-পাইলট গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির। বিকেল ৩টার দিকে হেলিকপটারটি কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে নিরাপদে পৌঁছায়। সে সময় তেজগাঁও বিমানবন্দর টাওয়ারে দায়িত্বরত উইং কমান্ডার কানিজ ফাতেমা সংক্ষিপ্ত বার্তার মাধ্যমে সামরিক হেলিকপটারটির উদ্ধার মিশন সংক্রান্ত বিষয় ঢাকা ট্রাফিক কন্ট্রোলকে অবহিত করেন। পরবর্তীতে ঘটনার পরপরই এয়ার কমোডর আব্বাসকে প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল, যিনি বর্তমানে এয়ার হেডকোয়ার্টার ইউনিটের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। অন্যদিকে কো-পাইলট রায়হান কবির বর্তমানে বাশার এয়ার বেইজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কুর্মিটোলা এয়ার বেইজ ও ভারতে উড়াল দেওয়ার মুহূর্ত
কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা যখন নামেন, তার আগেই সেখানে বিশেষ ট্রান্সপোর্ট বিমান (সি-১৩০ জুলিয়েট) রানিং ইঞ্জিন অবস্থায় প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বিমানে পূর্বে থেকেই অবস্থান করছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী ও তার পরিবারের সদস্যরা। বিমানে ওঠার পূর্বে শেখ হাসিনা উপস্থিত সামরিক কর্মকর্তাদের কাছ থেকে দেশের শেষ পরিস্থিতির বিবরণ শোনেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তার দেড় যুগের শাসনের অবসান নিশ্চিত হন। তবে রহস্যজনক কারণে তারিক সিদ্দিকী নিজে ওই বিমানে ওঠেননি; পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে জলপথে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং তাকে সহায়তার অভিযোগে তৎকালীন বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল গ্রেফতার হন।
পরবর্তী ধাপে এয়ার কমোডর শামীম রেজা এবং কো-পাইলট উইং কমান্ডার মাহফুজের পরিচালনায় সি-১৩০ বিমানটি ভারতের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে রাডার ও ট্র্যাকিং এড়াতে বিমানটির ট্রান্সপন্ডার পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং বিশেষ রুটে বিমানটি উড্ডয়ন করে। ভারত সীমানায় প্রবেশের পর কলকাতা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা হয় এবং বিকেল ৬টা ১৫ মিনিটে দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত হিন্দন বিমানঘাঁটিতে বিমানটি অবতরণ করে। সেখানে ভারতের প্রভাবশালী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানান। মিশন শেষে বিমানটির ক্রুরা পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসেন।
গোপনীয়তার নেপথ্যে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ও আইনি বিশ্লেষণ
পুরো রেসকিউ মিশনটি দুটি সুনির্দিষ্ট পর্যায়ে পরিচালিত হয়েছিল এবং এই সমন্বয়ের মূল দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবু সালেহ মান্নাফি। উল্লেখ্য, তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের তৎকালীন সহসভাপতি আবু আহমেদ মান্নাফির পুত্র। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর মান্নাফির পরিবারকে সেনানিবাসের ভেতরে নিরাপদ স্থানে আশ্রয়ে রাখা হয়েছিল বলেও সূত্রে প্রকাশ পায়। পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে সামরিক শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় প্রটোকল রক্ষা করা মূল লক্ষ্য ছিল বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের ঘোষণা: মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক বৈঠক শুরু
উক্ত রেসকিউ মিশনের আইনি ও নীতিগত দিক বিশ্লেষণ করে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর (অব.) এম সরোয়ার হোসেন জানান, দেশের বিদ্যমান আইন ও এসএসএফ প্রটোকল অনুসারে পদত্যাগের পরও সাবেক রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারী থাকেন। ফলে দায়িত্বে থাকা সামরিক কর্মকর্তা ও এসএসএফ সদস্যরা মূলতঃ আইনগত সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট অনুযায়ী বৈষম্যবিরোধী পরিস্থিতির মাঝে তাকে আটক করে আইনের হাতে তুলে দেওয়া যেত বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
সূত্র: বিভিন্ন সাবেক ও বর্তমান সামরিক সূত্র ও জাতীয় গণমাধ্যম প্রতিবেদন।
