প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ও তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের নির্দিষ্ট অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের জন্য এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া। বৃহস্পতিবার (০৬ আগস্ট) রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে আয়োজিত এক জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ও সার্বিক প্রস্তুতির চিত্র তুলে ধরেন। নির্বাচন কমিশনের এই ঘোষণার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
নির্বাচনী সময়সূচি ও মনোনয়ন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত
নির্বাচন কমিশনের সচিবালয় থেকে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার নির্ধারিত তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৩ আগস্ট। উক্ত দিন সকাল ১০টা থেকে শুরু করে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আগ্রহী প্রার্থী বা তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধিগণ নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট কার্যালয়ে সরাসরি উপস্থিত হয়ে তাঁদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। এর পরপরই জমা পড়া মনোনয়নপত্রগুলোর আইনি ও সাংবিধানিক বৈধতা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা হবে আগামী ১৬ আগস্ট। আর কোনো বৈধ প্রার্থী যদি কোনো কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চান, তবে তাঁদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ১৮ আগস্ট।
আরও পড়ুন: সাতকানিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের নাস্তায় বনফুলের পণ্য, বিতর্ক
চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্ধারিত হওয়ার পর আগামী ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে শুরু হয়ে টানা বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের নির্দিষ্ট অধিবেশন কক্ষে সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালট বা নির্ধারিত ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে এই ভোটাভুটি সম্পন্ন হবে। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সকল প্রকার আইনি ও লজিস্টিক প্রস্তুতি ইতিমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। চূড়ান্ত ফল ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ পেতে যাচ্ছে তার পরবর্তী সাংবিধানিক অভিভাবক।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের নিয়ম ও ভোটাধিকার
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ১৯৯১-এর সুনির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়া কিংবা শূন্য হওয়ার পরবর্তী নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংবিধানের নির্দেশনা মেনে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যবৃন্দের পরোক্ষ ভোটাধিকারের মাধ্যমেই রাষ্ট্রপ্রধান বাছাই করা হয়ে থাকে। একজন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের একজন সদস্যকে প্রস্তাবক এবং অপর একজন সংসদ সদস্যকে সমর্থক হিসেবে প্রস্তাব পেশ করতে হয়। পরবর্তীতে প্রার্থীকে তাঁর নিজস্ব সম্মতিসূচক স্বাক্ষর সংবলিত মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পেশ করতে হয়।
আরও পড়ুন: রিপাবলিক বাংলা ছাড়লেন বিত/র্কিত ভারতীয় সাংবাদিক ময়ূখ রঞ্জন
বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থার কাঠামো অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্বয়ং রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে পুরো নির্বাচনী কার্যক্রম তদারকি ও পরিচালনা করে থাকেন। যদি নির্বাচনে একের অধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বহাল থাকেন, তবে নির্ধারিত দিনে সংসদ কক্ষে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীকে বিজয়ী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করবে। আর যদি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মাত্র একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ বলে গৃহীত হয় এবং কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকেন, তবে আইন অনুযায়ী উক্ত প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করার নিয়ম রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদের শূন্যতা ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট
রাষ্ট্রপতি পদের এই নতুন নির্বাচনের আবহে দেশের প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শারীরিক অসুস্থতার কারণ দর্শিয়ে পদত্যাগ করার পরবর্তী সময়ে পদটি সাংবিধানিকভাবে শূন্য ঘোষণা করা হয়। সংবিধানের বিধান অনুসরণে রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে এবং নতুন রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সমস্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব সাময়িকভাবে ভারপ্রাপ্ত পদে ন্যস্ত থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে সংসদের কার্যপদ্ধতি নির্দেশিকা ও সংবিধান অনুযায়ী সাময়িক দায়িত্ব পালন প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর নব্বই দিনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার আলোকেই নির্বাচন কমিশন এ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ তফশিল প্রকাশে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
কমিশন সচিব জানান, নির্বাচন সুষ্ঠু ও সফলভাবে বাস্তবায়নে সংসদ সচিবালয়ের সঙ্গে ইতিপূর্বে বেশ কিছু উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সম্পন্ন করা হয়েছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের হালনাগাদ নামের তালিকা ইতিমধ্যে সংসদ সচিবালয় থেকে নির্বাচন কমিশনে হস্তান্তরিত হয়েছে। তালিকা প্রাপ্তির পর কমিশন তাদের নিজস্ব বৈঠকে বিস্তারিত পর্যালোচনার মাধ্যমে আজকের এই পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী তফসিল চূড়ান্ত রূপ দেয়। সমগ্র প্রক্রিয়াটি নিরপেক্ষ রাখা এবং রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
ইসির প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
ইসি সচিব আখতার আহমেদ নিশ্চিত করেছেন যে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো সর্বোচ্চ স্পর্শকাতর ও মর্যাদাপূর্ণ ভোটগ্রহণের কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আধুনিক ভোট প্রসেসিং নিশ্চিত করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদ কক্ষকেই আইনত এই নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ভোট গণনা এবং ফলাফল প্রকাশের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত থাকে। দেশের সার্বিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। আগামী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন থেকেই এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত আমেজ শুরু হতে যাচ্ছে।
সূত্র: নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় ও প্রেস ব্রিফিং।
