প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় গত জুন মাসে আঘাত হানা ভয়াবহ ও প্রলয়ঙ্করী জোড়া ভূমিকম্পে প্রাণহানির ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সরকারিভাবে হালনাগাদ করা নতুন তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ে নিহতের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে এখন ৬ হাজার ১২৫ জনে পৌঁছেছে। উদ্ধারকারীদের টানা অনুসন্ধান ও ধ্বংসস্তূপ অপসারণ কার্যক্রমের মধ্যে ধসে পড়া এলাকাগুলো থেকে প্রতিনিয়তই উদ্ধার করা হচ্ছে নিখোঁজ লাশের স্তূপ।
মঙ্গলবার (০৪ আগস্ট) ভেনেজুয়েলার জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান জর্জ রদ্রিগেজ সংবাদ সম্মেলনে ভূমিকম্পে প্রাণহানির এই নতুন ও ভয়াবহ পরিসংখ্যানে তথ্য দেশবাসীকে অবহিত করেছেন। উল্লেখ্য, গত ২৪ জুন দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলে পরপর ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি তীব্র জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। ওই ভয়াবহ ঘটনায় প্রায় ২০০টি বহুমুখী ও আবাসিক ভবন নিমেষেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ধ্বংসযজ্ঞের সবচেয়ে নির্মম তাণ্ডব ঘটেছে দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় রাজ্য 'লা গুয়ায়রা'য়। এর আগে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার ৫৪৬ জন ঘোষণা করা হলেও সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে নিহতের সংখ্যা ৬ হাজার ছাড়িয়ে গেল।
আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালি চুক্তি আসায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় পতন
পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়, জোড়া ভূমিকম্পের তাণ্ডবে সারা দেশে প্রায় ১৭ হাজার মানুষ মারাত্মকভাবে আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে দুর্ঘটনাস্থলে এখনও দিনরাত এক করে কাজ করে যাচ্ছেন উদ্ধারকারী দলের সদস্য ও স্বজনেরা। লা গুয়ায়রার রাজ্য গভর্নর জোসে আলেজান্দ্রো তেরান উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান যে, দুর্যোগের পর প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন মানুষ এখনও সরাসরি নিখোঁজ তালিকাভুক্ত রয়েছেন। যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে মোট নিখোঁজের সংখ্যা ঘোষণা করেনি, তবে আন্তর্জাতিক ত্রাণ বিশেষজ্ঞ ও উদ্ধারকারীদের একাংশের মতে প্রকৃত নিখোঁজের সংখ্যা ১০ হাজার ছুঁয়ে যেতে পারে।
দুর্যোগ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মাটিতে মিশে যাওয়া ১৯০টি ভবন ছাড়াও কর্তৃপক্ষ আরও প্রায় ১৬ হাজার ২০০টিরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে। ঝুঁকির কারণে হাজার হাজার মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে লা গুয়ায়রা ও রাজধানী কারাকাসের অন্তত ২৪ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষকে তড়িঘড়ি গড়ে তোলা অস্থায়ী সরকারি আশ্রয়শিবিরে সরিয়ে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের সংস্থান করা হয়েছে।
গৃহহীন ও বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ মানুষের দ্রুত বাসস্থান সুনিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদে এক বিশেষ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির আইনপ্রণেতারা। গৃহহীন ভুক্তভোগীদের বাড়ি ভাড়া নেওয়ার প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত ও সহজ করতে সর্বসম্মতিক্রমে একটি নতুন আইন অনুমোদন করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া এ পদক্ষেপের মাধ্যমে সাবেক বামপন্থী চাভিস্তা সরকারের শাসন আমলে পাস করা কড়া ‘ভাড়া-বিরোধী’ আইনটি আইনগতভাবে বাতিল করা হয়।
আরও পড়ুন: ভয়ের সংস্কৃতি চালু নিয়ে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য ও সিলেট সফর
সোমবার সকালে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন নেতা ডেলসি রদ্রিগেজ নতুন আইন বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, নমনীয় আইন প্রণয়নের ফলে ভূমিকম্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীন প্রায় ৪ লাখ পরিবার সরাসরি বাসা ভাড়ার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সুবিধা ও আশ্রয় পাবে। তিনি এই আইনি পরিবর্তনকে দেশের সাধারণ ভাড়াটিয়া এবং বাড়ির মালিক—উভয় পক্ষের জন্যই এক যুগান্তকারী ও ভারসাম্যপূর্ণ জয় হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া রদ্রিগেজ প্রতিশ্রুতি দেন যে, চলতি বছরের মধ্যেই ভূমিকম্পে সর্বস্ব হারানোদের ৪ হাজার তৈরি বাড়ি হস্তান্তর করা হবে এবং আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে এর আওতায় ১০ হাজারের বেশি গৃহহীন পরিবারকে স্থায়ী আবাসন প্রদানের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশেষ অভিযানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটনের কড়া তদারকি ও নজরদারিতে দেশটি পরিচালনা করছেন অন্তর্বর্তীকালীন এই প্রধান।
সূত্র: ভেনেজুয়েলা জাতীয় সংসদ ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা।
