ব্রেকিং নিউজ

শাহজালালের মাজারের দানের টাকা আত্মসাৎ বন্ধের দাবি

শাহজালালের মাজারের দানের টাকা আত্মসাৎ বন্ধের দাবি
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / সিরাজগঞ্জ

শাহজালালের মাজারের অর্থ সামাজিক কল্যাণে ব্যবহারের জোর দাবি: গোয়াইনঘাটে এনসিপির রাজনৈতিক সমাবেশ

সিলেটের পবিত্র ও ঐতিহাসিকভাবে প্রসিদ্ধ হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে বিশ্বজুড়ে অবস্থানরত অগণিত ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের প্রদত্ত বিপুল পরিমাণের অনুদান বা দানের টাকা যেন কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পকেটে না যায়—সে বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান সরকারকে কঠোর এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, সিলেটের আপামর জনসাধারণ সর্বদাই আত্মমর্যাদাশীল, সচ্ছল এবং সকল কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী। আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত সিলেটের প্রাণকেন্দ্র হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার শরিফ কেবল ধর্মীয় স্থান নয়, বরং সিলেটবাসীসহ গোটা দেশের মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। এই পবিত্র দরগাহে প্রতিদিন এবং বিভিন্ন বিশেষ সামাজিক বা ধর্মীয় উপলক্ষে যে বিপুল অর্থ অনুদান হিসেবে জমা হয়, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব এবং সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কর্তৃক আয়োজিত ঐতিহাসিক ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির সমাপনী সমাবেশে প্রধান বক্তার বক্তব্যে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী এসব তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা প্রদান করেন। গোয়াইনঘাটের এই গণসমাবেশে দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী এবং সাধারণ জনতার ঢল নামে। সেখানে তিনি দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং মাজারের অনুদান ব্যবস্থাপনার আমূল সংস্কারের গুরুত্ব বিশদভাবে তুলে ধরেন।

মাজারের দান এবং সুশাসনের নতুন রূপরেখা

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী জোর দিয়ে বলেন, ধর্মীয় ও পবিত্র স্থানসমূহ কেন্দ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের ঐতিহ্য রক্ষা করা দেশের সকল নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। এই মাজারে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা জমা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তার সঠিক বণ্টন বা কল্যাণমুখী ব্যবহার নিয়ে জনমনে সংশয় থেকে যায়। তিনি বলেন, এই দানের অর্থ যেন ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার কাজে ব্যবহৃত না হয়ে দেশের অসহায়, দরিদ্র, বস্ত্রহীন ও ক্ষুধার্ত মানুষের সেবায় এবং মাজার প্রাঙ্গণের আধুনিকায়নে সঠিকভাবে ব্যয় করা হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

আরও পড়ুন: গোবিন্দগঞ্জে পর্নোগ্রাফি চক্রের ৪ সদস্য গ্রেপ্তার

তিনি মাজারের অর্থ সঠিক খাতে খরচের জন্য সরকারের কাছে কতিপয় মৌলিক দাবি পেশ করেন:

  • মাজারে আসা যাবতীয় দানের অর্থের জন্য একটি নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে।
  • উপার্জিত অনুদানের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব সাধারণ জনগণের নিকট উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ রাখতে হবে।
  • জমা হওয়া অর্থের বড় একটি অংশ দেশের দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা এবং দুস্থ নাগরিকদের সুনির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করতে হবে।
  • মাজার শরিফ সংস্কার, আধুনিকায়ন ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীদের আন্তর্জাতিকমানের সুবিধা প্রদানে অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং রাজপথের লড়াই

বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক সংকট, অপশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এনসিপির সুদৃঢ় অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেন দলের এই কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক। তিনি অভিযোগ করেন যে, দেশে বিদ্যমান অসাধু রাজনৈতিক চক্র, দুর্নীতিবাজ আমলা এবং সমাজবিরোধী উপাদানের বিরুদ্ধে সত্য ও স্পষ্ট কথা বলার কারণেই তারা প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রীয় অনাচার, রাজনৈতিক হামলা এবং মিথ্যা মামলার শিকার হচ্ছেন। এনসিপির মূল শক্তিসমূহ গণমানুষের ভেতর থেকেই উঠে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চক্রান্তকারী ও অসাধু অপশক্তি কোনোভাবেই রাজপথের সত্যের সংগ্রামকে রুদ্ধ করতে পারবে না।

উপস্থিত বিপুল জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন:

"আপনারা যদি সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের পাশে থাকেন এবং আমাদের ন্যায়ের আন্দোলনকে সমর্থন যোগান, তবে পৃথিবীর কোনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী অপশক্তি কিংবা স্বৈরাচারী চক্র আমাদের অধিকার আদায়ের রাজপথ থেকে দমাতে পারবে না। আমরা জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আপসহীন লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।"

সরকারপ্রধানের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি ও পরামর্শ

সমাবেশে জাতীয় রাজনীতির নানা দিক তুলে ধরে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী নতুন নির্বাচিত সরকারপ্রধান তারেক রহমানের দেশ পরিচালনার নীতি নিয়েও আলোকপাত করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, জনগণের সুনির্দিষ্ট ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে যে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, তার সম্মান রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। চাটুকারদের কথায় চালিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে তার পরিণতি কখনোই শুভ হতে পারে না বলে তিনি সতর্ক করেন।

আরও পড়ুন: সিলেটের শ্রমিক নেতা মো. সোরমান আলীর মৃত্যুতে রাজনৈতিক ও শ্রমিক অঙ্গনে শোক।

সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি যে প্রধান দিকগুলো তুলে ধরেন:

  1. রাষ্ট্র পরিচালনায় চাটুকার ও অসৎ তোষামোদকারীদের থেকে দূরবর্তী দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
  2. সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও গণমানুষের মৌলিক দাবি ও মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
  3. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় যেকোনো মূল্যে দুর্নীতিবাজদের আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
  4. গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সুফল মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কার করতে হবে।

তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, যদি নির্বাচিত সরকার চাটুকার বেষ্টিত হয়ে পড়ে এবং গণমানুষের বাস্তব সমস্যা সমাধান ছেড়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত হয়, তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ধসে পড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি ও কর্মসূচির সাফল্য

গোয়াইনঘাটের এই 'জুলাই পদযাত্রা' কর্মসূচিটি স্থানীয় এনসিপি রাজনৈতিক পরিবেশকে চরম আলোড়িত করেছে। সমাবেশ প্রাঙ্গণে উপস্থিত এনসিপির অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারাও পর্যায়ক্রমে বক্তব্য রাখেন এবং দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে নিজেদের সুচিন্তিত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

উক্ত বর্ণাঢ্য গণসমাবেশ ও পথসভায় এনসিপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্যে স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন:

  • নাহিদ ইসলাম — কেন্দ্রীয় মুখপাত্র, জাতীয় নাগরিক পার্টি।
  • সারজিস আলম — কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক, জাতীয় নাগরিক পার্টি।
  • ডা. মাহমিদা আলম মিতু — কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য।
  • ডা. আতিক মুজাহিদ, এমপি — জাতীয় সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় সংগঠক।

এ ছাড়াও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি সিলেট জেলা, মহানগর ও গোয়াইনঘাট উপজেলার বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্থানীয় এনসিপির হাজার হাজার নেতা-কর্মী বর্ণাঢ্য মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন। পুরো এলাকা পদযাত্রা ও রাজনৈতিক স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গোয়াইনঘাটে এনসিপির এই সুসংগঠিত উপস্থিতি এবং ধর্মীয় স্থানগুলোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা সম্পর্কিত ইতিবাচক দাবি সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। সমাবেশ শেষে দেশ, জাতি এবং সিলেটের সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।


সূত্র: সিলেট আঞ্চলিক সংবাদ প্রতিনিধি ও এনসিপির কেন্দ্রীয় প্রেস বার্তা।

1 মন্তব্যসমূহ

প্রান্ত বাংলা নিউজে আপনাকে স্বাগতম। মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখুন। কোনো প্রকার অশালীন, হিংসাত্মক বা বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। ধন্যবাদ।

নবীনতর পূর্বতন