প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ
উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান বিভাগীয় শহর রংপুরে এক চরম বেদনাদায়ক, হৃদয়বিদারক এবং রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা জনমনে তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। একটি আবাসিক ভবনের ভেতর থেকে একই পরিবারের চার সদস্যের নিথর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে ঘিরে পুরো এলাকায় শোকের কালো ছায়া নেমে এসেছে। স্বাভাবিক জনজীবনে এই মর্মান্তিক ঘটনা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে এবং ঘটনাটির প্রকৃত উৎস ও কারণ উদ্ঘাটনে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের তদন্ত কার্যক্রম সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে শুরু করেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে রংপুর মহানগরীর কোতোয়ালি থানার আওতাধীন কামাল কাছনা এলাকার একটি তিনতলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবনে। স্থানীয় বাসিন্দারা শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই ভবনটির একটি নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট থেকে তীব্র ঝাঁঝালো ও অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি টের পান। দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি করার পরও ভেতর থেকে কোনো ধরনের সাড়াশব্দ না মেলায় এবং বাসাটি ভেতর থেকে সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ থাকায় স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে গভীর সন্দেহের জন্ম হয়। তাৎক্ষণিকভাবে এলাকার দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কোতোয়ালি থানা পুলিশকে অবহিত করেন।
আরও পড়ুন: মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় প্রতিবেশীদের অংশগ্রহণ নিয়ে তেহরানের চরম হুঁশিয়ারি
খবর পেয়ে পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে পুলিশ এক বিভীষিকাময় দৃশ্যের মুখোমুখি হয়। কক্ষের বিভিন্ন স্থানে চারজন মানুষের মরদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। নিহত ব্যক্তিরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার সহধর্মিণী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), তাদের তরুণী কন্যা প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫) এবং বারো বছর বয়সী নাবালক পুত্র প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)।
সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষে পুলিশ মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী এলাকায় অত্যন্ত মার্জিত, পরোপকারী এবং শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। একজন সাবেক শিক্ষকের গোটা পরিবারের এমন অস্বাভাবিক এবং মর্মান্তিক সমাপ্তি স্থানীয় বাসিন্দা এবং তার প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। পুরো এলাকা এখন গভীর শোকে নিমজ্জিত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঘটনার পেছনের মূল রহস্য উদঘাটন করতে পুলিশ, অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং পিবিআই-এর একাধিক বিশেষায়িত দল একযোগে ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। সিআইডির দক্ষ ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় আলামত, আঙুলের ছাপ ও জৈবিক নমুনা সংগ্রহ করেছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, এটি কোনো ঠান্ডা মাথার পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে, অথবা কোনো গভীর পারিবারিক সংকটের করুণ পরিণতি হিসেবেও রূপ নিতে পারে। বিষক্রিয়া বা শ্বাসরোধের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: তেজগাঁও থানা আকস্মিক পরিদর্শন করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: নাগরিক আস্থা অর্জনের নির্দেশ
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সঠিক সময়, মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং মৃত্যুর কার্যকারণ সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর। একই সাথে ওই পরিবারের সাম্প্রতিক পারিবারিক অবস্থা, আর্থিক লেনদেন এবং কারো সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই চাঞ্চল্যকর ট্র্যাজেডির নেপথ্যে কোনো অপরাধ চক্র জড়িত থাকলে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করার দৃঢ় আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
সূত্র: রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণী।