প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য এক জটিল ও চরম উত্তেজনাকর মোড়ে উপনীত হয়েছে। পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কৌশলগত অবরোধের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি অত্যন্ত কঠোর ও নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরান। নিজেদের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, ওয়াশিংটনের কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ বা আর্থিক অবরোধ বাস্তবায়নে যদি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সহায়তা প্রদান করে, তবে সেই রাষ্ট্রকে আর বন্ধুভাবাপন্ন হিসেবে গণ্য করা হবে না, বরং সরাসরি বৈরী বা শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হবে।
শনিবার তেহরানে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত নিরাপত্তা পর্যালোচনার পর এই চূড়ান্ত বার্তা প্রদান করেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই। তিনি আঞ্চলিক সমীকরণ ও বৈশ্বিক কূটনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, ইরানের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ স্থবির করে দেওয়ার লক্ষ্যে পশ্চিমা বিশ্বের চাপিয়ে দেওয়া যেকোনো অবৈধ ও একতরফা নিষেধাজ্ঞায় যদি কোনো প্রতিবেশী অংশ নেয়, তবে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দায়িত্ব কেবল তেহরানের একক নয়; বরং প্রতিবেশীদেরও তাদের ভূখণ্ডের অবস্থান ও সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
আরও পড়ুন: তেজগাঁও থানা আকস্মিক পরিদর্শন করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: নাগরিক আস্থা অর্জনের নির্দেশ
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ঘোষিত ইরানের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টির পরিকল্পনাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে সুস্পষ্টভাবে পক্ষ নির্ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক বা আর্থিক লেনদেন পরিচালনাকারী যেকোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেয় হোয়াইট হাউস। ওয়াশিংটনের এই সর্বাত্মক অর্থনৈতিক চাপের জবাবেই নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর ও প্রতিরক্ষামূলক করে তুলেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি।
তেহরানের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী মহলের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার যেকোনো আঞ্চলিক তৎপরতার বিরুদ্ধে ইরান কোনোভাবেই নমনীয় আচরণ প্রদর্শন করবে না। কোনো রাষ্ট্র যদি পশ্চিমা ব্লকের তুষ্টি অর্জনের জন্য ইরানের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে, তবে তাদের নিজ নিজ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থেও কার্যকর পাল্টা আঘাত হানার অধিকার তেহরান সংরক্ষণ করবে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো প্রকার সমঝোতা না করার এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন: কিডনি দিয়েও বাঁচানো গেল না স্বামীকে: ফরিদগঞ্জে শোকস্তব্ধ এক নারীর মানবিক লড়াই
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেল বাণিজ্য, হরমুজ প্রণালির সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্ব মারাত্মক অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে। পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার এই বহুমুখী অর্থনৈতিক যুদ্ধ যদি সামরিক উত্তেজনায় মোড় নেয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ফলে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে চরম সংঘাতমূলক পথ পরিহার করে দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও ইরান সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ প্রেস ব্রিফিং।