প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ
কুমিল্লার দেবিদ্বারে এক চরম নৃশংস, রোমহর্ষক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। ফরিদা ইয়াসমিন (৫০) নামে এক নিঃসঙ্গ গৃহকর্ত্রীকে নিজ বসতবাড়িতে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও খণ্ড-বিখণ্ড করে পলিথিনের প্লাস্টিক প্যাকেটে ভরে বাড়ির পেছনের নির্জন স্থানে ফেলে রাখার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে এক নারী ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধে। ঘটনার ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। শনিবার (৮ আগস্ট) সন্ধ্যার দিকে দেবিদ্বার পৌর এলাকার অন্তর্গত ছোট আলমপুর গ্রামে ভয়াবহ এই ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে ৯টি পৃথক প্লাস্টিক প্যাকেট থেকে নিহতের দেহের খণ্ডিত অংশসমূহ উদ্ধার করেছে। তবে এখনও নিহতের বিচ্ছিন্ন মাথা ও দুই পা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
একাকী জীবনের সুযোগ ও অনুসন্ধানের সূচনা
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, নিহত ফরিদা ইয়াসমিন তাঁর স্বামী এবং সন্তানদের সাথে গত প্রায় ৩০ বছর ধরে দেবিদ্বার পৌরসভার ছোট আলমপুর এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছিলেন। তাঁর স্বামী মফিজুল ইসলাম পেশাগত কারণে জাহাজে কর্মরত রয়েছেন এবং তাঁদের দুই কন্যাসন্তান— রাবেয়া বসরী ও মরিয়ম আক্তারের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তারা নিজ নিজ শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। ফলে ফরিদা ইয়াসমিন বাড়িতে বেশিরভাগ সময় একাই অবস্থান করতেন। নিরাপত্তা ও বাড়তি আয়ের উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর টিনশেড বাড়ির একটি কক্ষ লাইলী আক্তার নামের এক নারীকে ভাড়া দিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন: আগামীকাল সোমবার প্রকাশ হচ্ছে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল
ঘটনার বিবরণ দিয়ে স্বজনেরা জানান, শনিবার সকালে ফরিদার ছোট মেয়ে মরিয়ম আক্তার তাঁর মায়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে বাবার বাড়িতে আসেন। বাড়িতে প্রবেশ করে মাকে দেখতে না পেয়ে তিনি আশপাশে খোঁজখবর নিতে থাকেন। পরবর্তীতে স্বজনরা এসে সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো সন্ধান পাননি। একপর্যায়ে শনিবার সন্ধ্যার দিকে নিহতের বোনের ছেলে মামুন বাড়ির পেছনের ঝোপঝাড়ের পাশে বেশ কয়েকটি পলিথিনে মোড়ানো সন্দেহজনক প্যাকেট দেখতে পান। কৌতুহলবশত প্যাকেটগুলো খুলে ভেতরে মানুষের হাত, বুক ও খণ্ডিত মাংসপিণ্ড দেখতে পেয়ে তিনি চিৎকার দেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে খবর দেন।
জনতার হাতে আটক ও প্রাথমিক চাঞ্চল্যকর তথ্য
ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে স্থানীয় শত শত উৎসুক জনতা ঘটনাস্থলে এসে ভিড় জমান। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা সন্দেহভাজন ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তারকে আটক করে গণজিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। উপস্থিত জনতার চাপের মুখে লাইলী আক্তার নির্মম এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন। একই সাথে তিনি জানান যে একা এই কাজ করেননি; তাঁর সাথে তাঁর স্বামী আবুল কালাম আজাদ এবং রবিউল, সোহেল ও ইমন নামের স্থানীয় আরও ৩ জন যুবক এই লোমহর্ষক প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিয়েছিল।
আরও পড়ুন: যশোরে 'হানি ট্র্যাপ' চক্রের রাজা ও দুই নারী সহযোগী গ্রেফতার
সংবাদ পেয়ে দেবিদ্বার থানা পুলিশের একটি চৌকস দল রাত সাড়ে ৭টার দিকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তল্লাশি চালায়। সেখান থেকে পলিথিনে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্যাকেট করা নিহতের দেহের ৯টি টুকরো উদ্ধার করে ব্যাগেজ করা হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তারকে গ্রেফতার করে কড়া নিরাপত্তায় থানায় নিয়ে যায়। আটক লাইলী আক্তার দেবিদ্বার পৌর এলাকার চাঁপানাঘর গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী হিসেবে জানা গেছে।
পুলিশি তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপ
দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাস্থল থেকে পলিথিনে মোড়ানো খণ্ডিত মরদেহের ৯টি প্যাকেট উদ্ধার করা হলেও নিহতের মাথা এবং দুটি পা এখনও নিখোঁজ রয়েছে। সেগুলো উদ্ধারে পুলিশের টিম তৎপর রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আটক লাইলী আক্তারকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মূল পরিকল্পনাকারীসহ মোট চারজন সহযোগী পুরুষের নাম উঠে এসেছে। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশি প্রাথমিক পর্যালোচনায় ধারণা করা হচ্ছে, চুরি কিংবা পূর্ব শত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে নিহতের একাকীত্বের সুযোগ নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। লাশের উদ্ধারকৃত খণ্ডাংশগুলো ময়নাতদন্তের প্রসেসিংয়ের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণের প্রক্রিয়া চলছে। আইনগতভাবে মামলা দায়ের এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উন্মোচন করা হবে বলে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সূত্র: দেবিদ্বার থানা পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্র।
