প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে শর্তসাপেক্ষ জামিন পাওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড় নিয়েছে। পলাতক এই সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা যেন কোনোভাবেই বিচারের হাত থেকে রেহাই না পান, সেজন্য তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা এবং দুবাই আদালতের দেওয়া শর্তসাপেক্ষ জামিন বাতিলের লক্ষ্যে সর্বোচ্চ তৎপরতা জোরদার করেছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। আজ সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুরে রাজধানী ঢাকার জাতীয় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও কৌশলগত পর্যালোচনার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান ও আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সচিবালয়ে আয়োজিত এই ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম অর্থনৈতিক ও বিচারিক কেন্দ্র দুবাইয়ে অবস্থানরত বেনজীর আহমেদকে সেদেশের আদালত অন্তর্বর্তীকালীন ও শর্তসাপেক্ষ জামিন প্রদান করেছে। তবে এই জামিন স্থায়ী কিছু নয় এবং একে বাতিল করার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞ ও বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন একটি বিশ্বখ্যাত ল' ফার্ম বা আইনি প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে নিয়োগ প্রদান করেছে। উক্ত আইনি প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিচারিক নীতিমালা অনুসরণে যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ, দাপ্তরিক নথিপত্র এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে থাকা গুরুতর অভিযোগের প্রামাণ্য দলিলের ফাইল আনুষ্ঠানিকভাবে দুবাইয়ের বিচারিক কর্তৃপক্ষ ও আইন মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের ঘোষণা: মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক বৈঠক শুরু
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রিফিংকালে নিশ্চিত করেন যে, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশন ও দুবাইস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস সার্বক্ষণিকভাবে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ আইনি ও কূটনৈতিক প্রতিনিধি দল প্রতিদিনের আদালত এবং স্থানীয় প্রশাসনের গতিবিধি নিবিড়ভাবে তদারকি করছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে সরকার দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করেছে—প্রথমত, আন্তর্জাতিক আদালতে দৃঢ় আইনি প্রতিযোগিতা করা; এবং দ্বিতীয়ত, দুবাই সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখে আসামিকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার আওতায় নিয়ে আসা।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য জনসমক্ষে উন্মোচন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদের কাছে কেবল বাংলাদেশের মূল পাসপোর্টই বিদ্যমান নেই, বরং তিনি বিশ্বের একাধিক দেশের দ্বিতীয় নাগরিকত্ব, বিশেষ রেসিডেন্সি সুবিধা কিংবা ভিন্ন দেশের ট্রাভেল ডকুমেন্ট অর্জন করে থাকতে পারেন। আন্তর্জাতিক বিচারিক জটিলতা তৈরি করা এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে অবাধে গমনাগমনের কৌশল হিসেবে তিনি বিদেশি এই নথিগুলো ব্যবহারের চেষ্টা করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ও আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা (ইন্টারপোল)-সহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে, যেন এই অভিযুক্ত ব্যক্তি অন্য কোনো দেশে পালিয়ে যেতে না পারেন।
আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সার্বিক দিক তুলে ধরার পাশাপাশি প্রেস ব্রিফিংয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আসন্ন ৫ আগস্ট কেন্দ্রিক রাজনৈতিক আশঙ্কার বিষয়টিতেও গুরুত্বারোপ করা হয়। উক্ত দিনটিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্থিতিশীলতা তৈরির চক্রান্ত হতে পারে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ও দৃঢ় প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের দেশে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, রাজপথে নতুন করে আতঙ্ক ছড়ানো কিংবা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার মতো সর্বনিম্ন সাংগঠনিক সক্ষমতা বা রাজনৈতিক শক্তি এখন আর অবশিষ্ট নেই।
আরও পড়ুন: তামিম ইকবালের বেঙ্গালুরু সফর ও দেশের ক্রিকেটের অবকাঠামোগত রূপান্তর
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ৫ আগস্ট বা যেকোনো দিনকে কেন্দ্র করে উসকানিমূলক যেকোনো কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সমগ্র দেশে পুলিশের বিশেষ ইউনিট, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাকে সর্বোচ্চ স্তরের সতর্কতায় (হাই অ্যালার্ট) রাখা হয়েছে। জনগণের জানমালের ক্ষতিসাধন, সরকারি কিংবা বেসরকারি সম্পত্তিতে হামলা কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো ষড়যন্ত্র বরদাশত করা হবে না। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শতভাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের শান্তি বজায় রাখতে যেকোনো ধরনের কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবে না।
সার্বিকভাবে, সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে সরকারের মূল কৌশলগত লক্ষ্য অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে—একদিকে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে পলাতক অভিযুক্তদের আইনি জালে আবদ্ধ করে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে সকল প্রকার বিশৃঙ্খলা ও অপশক্তিকে কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রেখে জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত রাখা।
