প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ
ভরা বর্ষা মৌসুমে চারপাশের নদ-নদী পানিতে কানায় কানায় টইটম্বুর, ইলিশ আহরণে নেই কোনো ধরনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। অথচ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ইলিশের মূল তীর্থভূমি বরিশালের নদ-নদীগুলোতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত রুপালি ইলিশের দেখা। প্রতিকূলতা পেরিয়ে জেলেদের জালে যে সামান্য পরিমাণ মাছ ধরা পড়ছে, তার সিংহভাগই আকারে বেশ ছোট বা জাটকা আকৃতির; অন্যদিকে স্থানীয় বাজার ও আড়তগুলোতে তেলের মতো চড়া দাম। সরকারি মৎস্য বিভাগের হালনাগাদ তথ্যেও ইলিশের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসার সুনির্দিষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, দেশে ইলিশের স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার নেপথ্যে মূল চার নীতিবাচক কারণ দায়ী— নদী থেকে সাগরে অবাধ যাতায়াতের পথে বাধা ও নাব্যতা সংকট, নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়া, ক্ষতিকর অবৈধ জাল ও বাণিজ্যিক ট্রলিং বোটে অতিরিক্ত মাছ শিকার এবং পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক সহ বিষাক্ত পরিবেশ দূষণ।
ধারাবাহিক উৎপাদন পতন ও আড়তে আকাশচুম্বী দাম
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দক্ষিণ অঞ্চলে ইলিশের সার্বিক উৎপাদন টানা তিন-চার অর্থবছর ধরে ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশালে রেকর্ড ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন ইলিশ উৎপাদনের পর থেকে প্রতি বছরই এই সূচক নিম্নমুখী। পরবর্তীতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও হ্রাস পেয়ে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টনে নেমে আসে। আর সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইলিশের মোট উৎপাদন একলাফে কমে মাত্র ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে দাঁড়িয়েছে। ইলিশের প্রধানতম এই খরায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন মৎস্য খাতের সাথে যুক্ত লক্ষাধিক জেলে ও ব্যবসায়ী।
আরও পড়ুন: নীলছবির সেটে চরম য/ন্ত্র/ণা ও বীভৎসতার নেপথ্য গল্প প্রকাশ
বরিশাল নগরের বিখ্যাত পোর্ট রোড মৎস্য আড়তের অভিজ্ঞ পাইকারি ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন জানান, আড়তগুলোতে এখন বলতে গেলে ইলিশের দেখা মিলছেই না। অতি সম্প্রতি পোর্ট রোড মোকামে সারাদিনে মাত্র ৫০ মণ ইলিশ আমাদানি হয়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় নামমাত্র। আড়তে ১ হাজার ২০০ গ্রাম ওজনের প্রতি কেজি ইলিশ ৩ হাজার ২৫০ টাকা, ১ কেজির ইলিশ ২ হাজার ৭৫৯ টাকা, এলসি সাইজ (৮০০-৯০০ গ্রাম) ২ হাজার ৬৫৯ টাকা, ৫০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ ২ হাজার ১৫০ টাকা এবং জাটকা প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি হয়েছে। মূলত সমুদ্র মোহনায় বাণিজ্যিক ট্রলিং জালে অবাধে মাছ শিকার করার ফলে নদীতে মাছ আসছে না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
জেলেদের হতাশা ও গবেষকদের উদ্বেগ
মেঘনা নদী পরিবেষ্টিত মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া এলাকার চরম সংকটে থাকা জেলে তোফায়েল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, "এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে জালে নতুন সুতা বেঁধেছিলাম, কিন্তু ভরা বর্ষাতেও নদীতে ইলিশের দেখা নেই। যা-ও দু-একটি জালে আটকা পড়ছে, তার ওজন ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রামের বেশি হচ্ছে না।" একইভাবে বরিশাল সদরের চরমোনাই ও সায়েস্তাবাদ এলাকার প্রবীণ জেলে আবু মিয়া জানান, আজকাল নদীতে নামলে ইলিশের আশা করাটাই বৃথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীতে মাছের বংশই যেন বিলুপ্ত হতে চলেছে।
আরও পড়ুন: জাপানের সামরিক বৃদ্ধির সমালোচনায় উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপ/ণাস্ত্র পরীক্ষা
খ্যাতমান ইলিশ গবেষক ড. আনিচুর রহমান জানান, গত কয়েক বছরে ইলিশের মোট উৎপাদন এভাবে কমে যাওয়া এবং বড় আকারের মাছ ধরা না পড়া অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। এর ফলে ইলিশ নিজের প্রাকৃতিক সুষমতা হারাচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি সরেজমিনে একাধিক মাছঘাট পরিদর্শন করে দেখেছেন, বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে (আগস্টে) অন্য বছরের তুলনায় বাজারে ইলিশের আমাদানি অর্ধেকেরও কম। সামুদ্রিক মোহনায় অতিরিক্ত মাছ শিকার ও নদীগুলোর গভীরতা কমে যাওয়াকেই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
মৎস্য প্রশাসনের বক্তব্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি
বরিশাল জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান জানান, এ বছর ইলিশের আহরণ বেশ কম। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত সত্ত্বেও নদ-নদীতে আশানুরূপ ইলিশের দেখা মিলছে না। মূলত ডুবোচর এবং প্রবেশমুখে বাধার কারণে সাগর থেকে মাছ নদীতে পাড়ি জমাতে পারছে না। তিনি আরও যোগ করেন যে, সম্প্রতি গবেষণায় ইলিশের দেহে অতিসূক্ষ্ম ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’-এর উপস্থিতি ধরা পড়েছে। এটি এক নতুন বড় আপদ। মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাবে ভবিষ্যতে ইলিশের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে এবং সময়মতো পেটে ডিম আসবে না, যা সামগ্রিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বরিশাল জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৯ হাজার টন ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও জুন পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে মাত্র ৩৭ হাজার টন, যা বাস্তব চিত্রের চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর ও পোর্ট রোড মৎস্য আড়তদার সমিতি।
_11zon.webp)