ব্রেকিং নিউজ

নেত্রকোনায় ভাইরাল রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ: ৫ লাখ টাকায় সালিশ নিষ্পত্তির ভিডিও নিয়ে বিতর্ক

নেত্রকোনায় ভাইরাল রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ: ৫ লাখ টাকায় সালিশ নিষ্পত্তির ভিডিও নিয়ে বিতর্ক

                                                                     ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বহুল পরিচিত মুখ এবং দেশজুড়ে ভাইরাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে ধর্ষণের ভয়াবহ ও মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি দেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোর আওতায় না এনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের উদ্যোগে গ্রাম্য বিচার বা সালিশের মাধ্যমে ধামাচাপা দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর ৫ লাখ টাকার অর্থদণ্ড বা জরিমানা আরোপের তথ্য সামনে এসেছে। সেই সালিশি বৈঠকের এক গোপন ভিডিওচিত্র সোমবার (৩ আগস্ট) মধ্যরাতে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো নেত্রকোনা জেলাজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা, বিতর্ক ও জনঅসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—ধর্ষণের মতো একটি জঘন্য ও অসংযোগযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ কি কোনোভাবে বেআইনি গ্রাম্য সালিশির মাধ্যমে অর্থদণ্ড দিয়ে মীমাংসা করা সম্ভব? এ ঘটনা সংক্রান্ত সংবাদ ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের না হওয়ায় মূল আইনি প্রক্রিয়া থমকে রয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, সংবেদনশীল এই ঘটনাটি নেত্রকোনা সদর উপজেলার অন্তর্গত দক্ষিণ বিশিউড়া ইউনিয়নে সংঘটিত হয়েছে। ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবারের সরাসরি অভিযোগ, একই এলাকার বাসিন্দা অভিযুক্ত রিপন মিয়া দীর্ঘদিন ধরে তাদের মেয়েকে কুরুচিপূর্ণ উপায়ে উত্ত্যক্ত ও প্রলুব্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। ঘটনার দিন বাড়ির উঠানে রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় কৌশল অবলম্বন করে মেয়েটিকে বাড়ির পেছনে নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে অনৈতিক নির্যাতন চালান তিনি।

আরও পড়ুন: ইনফান্তিনোর ওপর বাড়ছে অনাস্থা: ফিফা সভাপতির প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার ৪ দেশের

ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে ধরা হয় যে, ঘটনাটি ঘটাকালীন স্থানীয় দুই প্রত্যক্ষদর্শী তা দেখে ফেললে অভিযুক্ত রিপন মিয়া তাদের মুখ বন্ধ রাখতে ৫০ হাজার টাকার নগদ উৎকোচ দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালান। পরবর্তীতে ঘটনাটি গ্রামে জানাজানি হলে ভুক্তভোগী পরিবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দ্বারস্থ না হয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের দ্বারস্থ হয়। এর জের ধরে দক্ষিণ বিশিউড়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির একটি অস্থায়ী কার্যালয়ে তড়িঘড়ি করে এক বিচার বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ওই সালিশি বৈঠকে ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের একাধিক রাজনৈতিক নেতা উপস্থিত ছিলেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

উক্ত বিচারে উপস্থিত বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অভিযুক্ত রিপন মিয়া নিজের অপরাধ স্বীকার করে নেন। এরপর সেখানে উপস্থিত সালিশদাররা তার ওপর নগদ ৫ লাখ টাকার জরিমানা ধার্য করেন এবং আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে সেই টাকা পরিশোধ করার সময়সীমা বেঁধে দেন। বৈঠকের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর সচেতন মহল কঠোর বিচার দাবি করছেন। এদিকে ভুক্তভোগী কিশোরীর মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তারা অত্যন্ত দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের সদস্য। আইনি লড়াই চালানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য বা আইনি সচেতনতা না থাকায় বাধ্য হয়ে স্থানীয় মাতব্বরদের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তবে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ায় এখন তারা সরকারের উচ্চপর্যায় ও পুলিশের কাছে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছেন।

এলাকাবাসীদের একাংশের গুরুতর অভিযোগ, বিতর্কিত এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও একাধিক নারীদের যৌন হয়রানি ও অশালীন আচরণের ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু প্রতিবারই স্থানীয়ভাবে বিষয়টি চেপে যাওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর আইনি পদক্ষেপ বা সাজা হয়নি। অন্যদিকে, সমস্ত অভিযোগকে অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত রিপন মিয়ার স্ত্রী চম্পা আক্তার। তিনি জানান, ব্যক্তিগত শত্রুতাবশত একটি মহল সুপরিকল্পিত ষড়যুদ্ধে তার স্বামীকে জঘন্য মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

আরও পড়ুন: হবিগঞ্জে সারজিস আলম ও নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীসহ ১০ এনসিপি নেতার বিরুদ্ধে মামলা

ঘটনার ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের। তিনি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন যে, পুলিশের পক্ষ থেকে প্রাথমিক খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে, তবে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লিখিত এজাহার বা অভিযোগ পাওয়া মাত্রই দ্রুত মামলা নথিভুক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ওসি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিচার কোনোভাবেই গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির বিন্দুমাত্র আইনগত সুযোগ নেই।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের দিকে ফেসবুকে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি শুরু করে সাধারণ গ্রামীণ মেঠো সংলাপ "হাই, আই অ্যাম রিপন ভিডিও" এবং "আই লাভ ইউ, এটাই বাস্তব"-সংলাপের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি ও ভাইরাল খ্যাতি লাভ করেন রিপন মিয়া। বর্তমানে তিনি নিজ গ্রামে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন। তবে সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগের সত্যতা আদালতের আইনি বিচারে প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে।

সূত্র: নেত্রকোনা মডেল থানা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

প্রান্ত বাংলা নিউজে আপনাকে স্বাগতম। মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখুন। কোনো প্রকার অশালীন, হিংসাত্মক বা বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। ধন্যবাদ।

নবীনতর পূর্বতন