ব্রেকিং নিউজ

মাধবদীতে স্ত্রীকে হত্যার পর মাটিচাপা, স্বামী গ্রেপ্তার

মাধবদীতে স্ত্রীকে হত্যার পর মাটিচাপা, স্বামী গ্রেপ্তার
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ

পারিবারিক কলহের জেরে নিজ স্ত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যার পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে রাতের অন্ধকারে মরদেহ নির্জন কবরস্থানে মাটিচাপা দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। নরসিংদীর মাধবদী থানা এলাকার এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে ঘাতক স্বামীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে থানা পুলিশ। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো এলাকাজুড়ে চরম ক্ষোভ, শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের শিকার গৃহবধূর নাম হোসনে আরা বেগম (৩৫)। তিনি কাঠালিয়া ইউনিয়নের নোয়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা মোঃ রহমান মিয়ার মেয়ে। অন্যদিকে এই পৈশাচিক ঘটনার মূল অভিযুক্ত ও গ্রেপ্তার হওয়া ঘাতক স্বামীর নাম শরীফ মিয়া (৪২)। সে মাধবদীর ভগীরথপুর গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে। স্থানীয় মাধবদী গরুর হাট বাজার সংলগ্ন এলাকায় একটি চা দোকানে সাধারণ শ্রমিকের কাজ করত শরীফ। তবে একজন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অন্তরালে যে এমন ভয়ঙ্কর ও নিষ্ঠুর অপরাধী মানসিকতা লুকিয়ে থাকতে পারে, তা এখন স্থানীয়দের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মাকে হ/ত্যা: বাদী মেয়ে চাম্পা গ্রেপ্তার, আদালতে স্বীকারোক্তি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং নিহতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার এক ভয়াবহ বিবরণ পাওয়া যায়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ১৭ আগস্ট সোমবার দিবাগত রাত আনুমানিক আটটার দিকে পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে ক্রোধের বশবর্তী হয়ে শরীফ মিয়া তার স্ত্রী হোসনে আরা বেগমের ওপর চড়াও হয় এবং তাকে প্রচণ্ড জোরে সজোরে আঘাত ও চড়-থাপ্পড় মারে। প্রচণ্ড আঘাতের তীব্রতায় হোসনে আরা ভারসাম্য হারিয়ে ঘরের টিউবওয়েলের ওপর আছড়ে পড়েন এবং মুহূর্তের মধ্যেই জ্ঞান হারিয়ে নিথর হয়ে যান।

জ্ঞান হারানোর পর হোসনে আরার আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে একজন সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক দায়িত্ব ছিল দ্রুত কোনো হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। কিন্তু ঘাতক স্বামী তা না করে নিজের অপরাধ আড়াল করার কুৎসিত চক্রান্তে মেতে ওঠে। সে কোনো প্রকার চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে নিথর দেহটিকে ঘরের শক্ত মেঝের ওপর লুকিয়ে রাখে। সারারাত ও পরের পুরোটা দিন লাশটি এভাবেই পড়ে থাকে ঘরের ভেতর।

পরদিন ১৮ আগস্ট রাত গভীর হলে এবং চারপাশের পরিবেশ শান্ত ও নিস্তব্ধ হয়ে এলে শুরু হয় অপরাধের দ্বিতীয় ধাপ। রাত দশটার পর ঘাতক শরীফ একাই তার স্ত্রীর নিথর মরদেহ কাঁধে তুলে নেয়। এরপর রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি নির্জন কবরস্থানে গিয়ে গোপনে গর্ত খুঁড়ে লাশটি মাটিচাপা দিয়ে চলে আসে। বাড়ি ফিরে সে এক নিখুঁত নাটকের অবতারণা করে এবং প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনকে প্রচার করতে থাকে যে তার স্ত্রী অভিমান করে রাগ দেখিয়ে বাড়ি থেকে কোথাও চলে গেছেন।

ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৯ আগস্ট দুপুরে ঘাতক শরীফ তার শ্বশুরকে সঙ্গে নিয়ে মাধবদী থানায় হাজির হয়। সেখানে গিয়ে সে নাটক সাজিয়ে স্ত্রী নিখোঁজ হয়েছেন মর্মে একটি সাধারণ ডায়েরি করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু থানায় কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় তার আচরণ, বাচনভঙ্গি ও অসংলগ্ন কথাবার্তায় চরম সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পুলিশ তৎক্ষণাৎ সাধারণ ডায়েরি লিপিবদ্ধ না করে একটি আনুষ্ঠানিক নিখোঁজ অভিযোগ গ্রহণ করে এবং তাকে বিশেষ নজরদারির আওতায় নিয়ে আসে।

আরও পড়ুন: মান্দায় মসজিদের ভেতর মুসল্লিকে কু/পিয়ে হ/ত্যা/র ঘটনায় শ্যালক গ্রে/প্তার 

অভিযোগ দায়ের শেষে শরীফ তার শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যায়। পরবর্তীতে পুলিশের গোপন নজরদারি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সন্দেহ তীব্রতর হতে থাকে। একই দিন রাতে নোয়াকান্দা এলাকায় স্থানীয় জনতা তাকে অবরুদ্ধ করে পুলিশে খবর দেয়। মাধবদী থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত সেখানে গিয়ে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে এবং দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ চালায়। নিবিড় জেরার মুখে একপর্যায়ে ঘাতক শরীফ ভেঙে পড়ে এবং নিজের স্ত্রীকে নির্মমভাবে আঘাত করে হত্যা করার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে কবরস্থানে মাটিচাপা দেওয়ার পুরো ঘটনা অকপটে স্বীকার করে।

স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার দুপুরে নরসিংদী সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেফতাহুল হাসানের উপস্থিতিতে এবং নরসিংদী জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাজহারুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে কবর থেকে নিহতের মরদেহ উত্তোলন করা হয়। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের উদ্দেশ্যে নরসিংদী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন এই রোমহর্ষক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, স্ত্রী নিখোঁজের দাবি নিয়ে যখন শরীফ থানায় আসে, তখনই তার চলাফেরা ও বক্তব্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে লোমহর্ষক এই অপরাধের কথা স্বীকার করে। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত ঘাতক স্বামীকে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ আরও পরিষ্কারভাবে জানা যাবে এবং দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রয়োজনীয় সকল আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নোয়াকান্দা ও ভগীরথপুর গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতের স্বজন ও সাধারণ গ্রামবাসী অবিলম্বে এই ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।

তথ্যসূত্র: মাধবদী থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

প্রান্ত বাংলা নিউজে আপনাকে স্বাগতম। মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখুন। কোনো প্রকার অশালীন, হিংসাত্মক বা বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। ধন্যবাদ।

নবীনতর পূর্বতন