প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ
বাবার নিথর নিশ্বাসহীন দেহ তখন নিজ বসতবাড়িতে রাখা। নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীরা সবাই মিলে অশ্রুসজল চোখে প্রিয় মানুষটিকে শেষ বিদায় জানানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অথচ এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির কিছুই জানত না অদম্য মেধাবী ছাত্রী ঋতু খাতুন। বাবার আকস্মিক প্রয়াণের খবর পরীক্ষা শেষ হওয়া না পর্যন্ত তার কাছে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল। পরিবারের একটাই করুণ মিনতি ও চাওয়া ছিল— যে মানুষটির স্বপ্ন পূরণের জন্য মেয়েটি দীর্ঘ পরিশ্রম করেছে, অন্তত আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি শেষ হওয়া পর্যন্ত যেন বাবাকে চিরতরে হারানোর সেই নিষ্ঠুর খবরটি মেয়েকে না জানানো হয়।
পরীক্ষার কক্ষে ঋতু ও হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস
ঘটনাটি ঘটেছিল গত ১০ মে, যেদিন এসএসসির 'বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা' বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। সেদিন ভোররাতে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে দূরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ঋতুর বাবা কবির হোসেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতার সাথে লড়াই করছিলেন। একদিকে স্বজনেরা যখন হাসপাতাল থেকে বাবার মরদেহ বাড়িতে আনার আয়োজন করছিলেন, ঠিক তখনই আনুমানিক ১০ কিলোমিটার দূরে চৌগাছা শহরের ছারা পাইলট বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে অন্যান্য সহপাঠীদের সাথে এসএসসি পরীক্ষায় বসেছিল ঋতু।
আরও পড়ুন: সালমান শাহ হ/ত্যা মামলায় গ্রে/প্তার হলেন খল অভিনেতা ডন
পরীক্ষার হলে উত্তরপত্রের পাতায় কলম চালিয়ে নিজের জীবনের সেরা চেষ্টা করে যাচ্ছিল মেয়েটি, অথচ সে বিন্দুমাত্র টের পায়নি যে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ও ছায়াদানকারী মানুষটি আর এই ধরাধামে বেঁচে নেই। পরীক্ষা শেষে সহপাঠীদের সাথে হাসিমুখে কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরে যখনই উঠানে মানুষের ভিড় আর কান্নার রোল দেখতে পায়, তখনই জানতে পারে পিতা হারানোর সেই কঠিন বাস্তবতা। মুহূর্তের মধ্যে থমকে যায় তার কিশোরী জীবন। শেষবারের মতো পরম মমতায় বাবার মুখটি দেখে চোখের জলে শেষ বিদায় জানায় সে।
শোক চেপে পরীক্ষার সাফল্য ও অভাবের সংসার
বুকের ভেতরে বাবা হারানোর পর্বতসম শোক ও তীব্র যন্ত্রণা চেপে রেখেও ঋতুকে আবারও পাঠ্যবই আর খাতা নিয়ে বসতে হয়েছিল। কারণ একটি বিষয়ের পরীক্ষা শেষ হলেও সামনে তখনও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অংশ নেওয়া বাকি ছিল। পিতার স্মৃতি ও তাঁর দেখা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে প্রতি ফোঁটা চোখের জল মুছে ঋতু অংশ নেয় বাকী সব পরীক্ষায়। অদম্য ইচ্ছা ও মানসিক শক্তির কাছে পরাস্ত হয় চরম পারিবারিক শোক।
অবশেষে ঘোষিত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলেই মিলেছে ঋতুর সেই আত্মত্যাগের প্রতিদান। মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ অর্জন করেছে ঋতু খাতুন। তবে এই অভাবনীয় সাফল্য আনন্দের জোয়ার নিয়ে আসলেও পুরো পরিবারের জন্য তা এক গভীর বেদনার স্মৃতি তৈরি করেছে। যে বাবা মেয়েকে নিয়ে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন দেখতেন এবং এই ফল হাতে পেলে যে মানুষটি বিশ্বসেরা আনন্দিত হতেন, তিনি ফল প্রকাশের এই শুভদিন দেখে যেতে পারেননি।
পরিবারের পরিচিতি ও অনিশ্চিত উচ্চশিক্ষা
মেধাবী ঋতু খাতুন যশোরের চৌগাছা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। হাকিমপুর গ্রামের মৃত দিনমজুর কবির হোসেন ও রেহেনা খাতুন দম্পতির দুই কন্যাসন্তানের মধ্যে ঋতু ছোট। তার বড় বোনের ইতিপূর্বে বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারটির ওপর নেমে এসেছে তীব্র আর্থিক অনটন ও চরম অনিশ্চয়তা।
আরও পড়ুন: আগামীকাল সোমবার প্রকাশ হচ্ছে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল
নিজের সাফল্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলতে গিয়া আবেগাপ্লুত ঋতু জানায়, "আমার বাবা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে আমার এই সাফল্য দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন এবং আমাকে জড়িয়ে ধরতেন। আপনারা সবাই আমার মরহুম বাবার রুহের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করবেন। বাবাকে চিরতরে হারানোর পর এখন আমার ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষা কীভাবে চালিয়ে যাব, তা নিয়ে চরম চিন্তায় দিন কাটছে।" অদম্য এই মেধার আলো যেন অর্থাভাবে নিভে না যায়, সে জন্য স্থানীয় সুশীল সমাজ ও শিক্ষা অনুরাগী মহল সহায়তার হাত বাড়ানোর আকুতি জানিয়েছেন।
সূত্র: ভুক্তভোগী পরিবার, হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও স্থানীয় সাংবাদিক।
