ব্রেকিং নিউজ

কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই লক্ষ্মীপুর পিটিআইয়ে ৩৩ কোটি টাকার ফাইনাল বিল লোপাট

 

কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই লক্ষ্মীপুর পিটিআইয়ে ৩৩ কোটি টাকার ফাইনাল বিল লোপাট
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ

প্রকল্পের বাস্তব নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। ভবনের একাধিক অংশে এখনো পুরোদমে চলছে অবকাঠামোগত নির্মাণ ও ফিনিশিংয়ের নানা কাজ। অথচ লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) দুটি বহুতল ভবন নির্মাণকাজের বিপরীতে প্রায় ৩৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার চূড়ান্ত বা ফাইনাল বিল সম্পূর্ণ পরিশোধ করার এক নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবনের বিপরীতে পরিশোধিত বিল প্রায় ২১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং মহিলা হোস্টেল ভবনের বিল প্রায় ১১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। প্রকল্পের কাজ মাঠপর্যায়ে শতভাগ সম্পন্ন না হতেই এত বিপুল অঙ্কের অর্থ তড়িঘড়ি ছাড় করার ঘটনায় স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিল অনুমোদন, কাজের পরিমাপ ও প্রকল্প তদারকির স্বচ্ছতা নিয়ে চরম প্রশ্ন উঠেছে।

আরও পড়ুন: বিএনপির মহাসচিব পদ ছাড়লেন মির্জা ফখরুল, হলেন রাষ্ট্রপতি প্রার্থী

সরেজমিন চিত্র ও কাজের অসম্পূর্ণতা

শনিবার (১৫ আগস্ট) সরেজমিনে লক্ষ্মীপুর পিটিআই ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবনের বিভিন্ন অংশের কাজ এখনো অসমাপ্ত। ভবনের ভেতর-বাইরে আস্তর, চুনকাম ও রঙের কাজ, মেঝের টাইলস, কক্ষের দরজা-জানালা লাগানো, সিলিং ফ্যান, লাইটসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং প্রাতিষ্ঠানিক ফার্নিচার বসানোর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, পাঁচতলা মহিলা হোস্টেল ভবনের প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ এখনো বাকি থাকা সত্ত্বেও কাগজপত্রে শতভাগ সমাপ্ত দেখিয়ে সম্পূর্ণ চূড়ান্ত বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।

এলজিইডির আনুষ্ঠানিক নথি অনুযায়ী, পিটিআইয়ের পাঁচতলা বিশিষ্ট একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবন নির্মাণকাজের অনুমোদিত চুক্তিমূল্য ছিল প্রায় ২২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এ কাজের নির্ধারিত মেয়াদ ছিল ৬ ডিসেম্বর ২০২৩ থেকে ১৪ অক্টোবর ২০২৪ পর্যন্ত। অন্যদিকে, মহিলা হোস্টেল ভবন নির্মাণকাজের চুক্তিমূল্য প্রায় ১৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা (আনুমানিক প্রকল্প ব্যয় ১৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা)। এই প্রকল্পের সময়সীমা ছিল ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত। দুটি প্রকল্পে সম্মিলিত চুক্তিমূল্য প্রায় ৩৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকার বিপরীতে ইতোমধ্যে ৩৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা ফাইনাল বিল হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জুন ক্লোজিং ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অর্থবছর শেষের তথাকথিত ‘জুন ক্লোজিং’-কে পুঁজি করে এবং সরকারি অর্থ ফেরত যাওয়ার অজুহাতে অস্বাভাবিক দ্রুততায় এই বিল ছাড় করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মাঠপর্যায়ের কাজের বাস্তব অগ্রগতির তুলনায় অর্থ ছাড়ের গতি ছিল কয়েক গুণ বেশি।

আরও পড়ুন: ফ্যাটি লিভারের চর্বি গলাতে ওষুধের চেয়েও কার্যকর আদা, জানুন খাওয়ার সঠিক নিয়ম

এর আগেও উন্নয়ন প্রকল্পের বিল ছাড়ের বিনিময়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৫ শতাংশ হারে অবৈধ কমিশন দাবির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল এলজিইডি। গত ২৮ জুলাই তদন্ত কমিটি সরেজমিনে অনুসন্ধান চালালেও রহস্যজনক কারণে এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। স্থানীয় ঠিকাদারদের দাবি, কোনো শাস্তি না হওয়ায় উপজেলা প্রকৌশলী আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এবং যোগসাজশের মাধ্যমে কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল ছাড়ের সুযোগ করে দিয়েছেন।

পদায়ন বিধি লঙ্ঘন ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

এদিকে গত ২ জুলাই এলজিইডির জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো কর্মকর্তা নিজ জেলা কিংবা স্বামী বা স্ত্রীর জেলায় পদায়ন পেতে পারবেন না। অথচ উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের নিজ বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় হওয়া সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে একই জেলার সদর উপজেলা প্রকৌশলীর গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বহাল রয়েছেন, যা সরকারি বদলি নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ফাইনাল বিল উত্তোলনের বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বেলাল হোসেন বলেন, "আমি ফাইনাল বিল তুলে নিয়েছি ঠিকই, তবে টাকা নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাইনি। কাজ দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করে দিচ্ছি।" অন্যদিকে সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন সাংবাদিকদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, "আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সব কাজ সম্পন্ন হবে। তখনই এসে তথ্য নেবেন, এখন কোনো বক্তব্য দেওয়া যাবে না।" এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী নিয়মবহির্ভূতভাবে ফাইনাল বিল দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও সংবাদমাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানান।

সূত্র: লক্ষ্মীপুর এলজিইডি নথি ও স্থানীয় তদন্ত প্রতিবেদন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

প্রান্ত বাংলা নিউজে আপনাকে স্বাগতম। মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখুন। কোনো প্রকার অশালীন, হিংসাত্মক বা বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। ধন্যবাদ।

নবীনতর পূর্বতন