প্রতিবেদন: সিরাজুল ইসলাম / শাহজাদপুর / প্রান্ত বাংলা নিউজ
ভালোবাসার গল্প কখনো কখনো বাস্তবতার সকল সীমানা ও সামাজিক ধারণাকে অতিক্রম করে তৈরি করে নতুন ইতিহাস। জার্মানির এক পেশাদার নারী চিকিৎসক ও পাকিস্তানের এক সাধারণ গ্রামীণ তরুণের সম্পর্কের সূচনা বাস্তব কোনো মঞ্চ বা পরিচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটেনি; বরং অনলাইন জনপ্রিয় ভিডিও গেমিং প্ল্যাটফর্ম ‘রোবলক্স’ (Roblox)-এর মাধ্যমে ঘটেছিল তাঁদের প্রথম পরিচয়। সেই ভার্চুয়াল গেমিং চ্যাটের সূত্র ধরে মাত্র পাঁচ মাসের ভালোবাসার টানে সুদূর ইউরোপ ছেড়ে পাকিস্তানে ছুটে এসে ২২ বছর বয়সী তরুণ মুহাম্মদ আকমলকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন ২৬ বছর বয়সী জার্মান নারী চিকিৎসক সেলমা। সীমান্ত ও সংস্কৃতির প্রাচীর ভেঙে যাওয়া এই ব্যতিক্রমী আন্তঃদেশীয় প্রেমের ঘটনাটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে ‘দৈনিক যুগের কথা’ কার্যালয় পরিদর্শন করলেন ডিএফপির প্রতিনিধি দল
গেমিং প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রেমের শুভ সূচনা
পাকিস্তানি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ২৬ বছর বয়সী তরুণী চিকিৎসক সেলমা জার্মান ও বসনিয়ান উভয় দেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব বহন করেন। অন্যদিকে তাঁর জীবনসঙ্গী ২২ বছর বয়সী তরুণ মুহাম্মদ আকমল পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মাণ্ডি বাহাউদ্দিন জেলার প্রত্যন্ত দাফার (ডিফার) গ্রামের বাসিন্দা। অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্ম রোবলক্সে গেম খেলার সময় দুজনের মাঝে নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদান শুরু হয়। সাধারণ গেমিং যোগাযোগ থেকে ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় গভীর বন্ধুত্ব ও আত্মিক সম্পর্কে।
মুহাম্মদ আকমল জানান, ভার্চুয়াল যোগাযোগের খুব অল্প সময়ের মাথায় তিনি সেলমাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেন। ইউরোপের নাগরিক হিসেবে প্রথমে পাকিস্তানে আসার বিষয়ে সেলমার কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও আকমলের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার টানে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই পাকিস্তানে পাড়ি জমানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
ইউরোপের আধুনিকতা ছেড়ে পাকিস্তানের গ্রামীণ জীবনে অভিষেক
জার্মানির উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসাসেবার বিলাসবহুল জীবন পেছনে ফেলে পাকিস্তানের প্রত্যন্ত গ্রামের পরিবেশে নতুন সংসার শুরু করা সেলমার জন্য ছিল এক অবিশ্বাস্য ও ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা। ইউরোপীয় জীবনযাত্রার সাথে অভ্যস্ত একজন পেশাদার চিকিৎসকের সামনে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সাধারণ চালচলন প্রথমদিকে খানিকটা কঠিন ঠেকলেও স্বামীর প্রতি নিখাদ ভালোবাসায় তিনি তা আপন করে নিয়েছেন।
আরও পড়ুন: ক্রিয়েটরদের জন্য এআই সহকারীযুক্ত নতুন অ্যাপ আনল মেটা
এক সাক্ষাৎকারে সেলমা জানান, পাকিস্তানের পল্লী অঞ্চলে এসে নিজ হাতে কাপড় কাচা, থালাবাসন ধোয়া, উনুনে রুটি তৈরি এবং গৃহস্থালির অন্যান্য দেশীয় কাজ করা তাঁর কাছে শুরুতে একদম নতুন ও চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছিল। তবে পরিবারের সদস্যদের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও স্বামীর ভালোবাসায় অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি গ্রামের এই আবহ ও দৈনন্দিন কাজের সাথে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
ভাষা শিক্ষা ও দুই পরিবারের আনুষ্ঠানিক সম্মতি
কেবল বিয়ে করেই থেমে থাকেননি সেলমা; বরং শ্বশুরবাড়ির সদস্য ও স্থানীয় গ্রামবাসীর সাথে সাবলীলভাবে মিশে যেতে তিনি বর্তমানে স্থানীয় উর্দু ও পাঞ্জাবি ভাষা শেখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার এই আন্তরিক প্রয়াসটি গ্রামবাসী ও নেটিজেনদের মন জয় করেছে। জানা গেছে, দুই পরিবারের পারস্পরিক পূর্ণ সম্মতি ও উপস্থিতিতেই অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে এই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
সেলমা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তিনি ইউরোপে ফিরে যাওয়ার চেয়ে পাকিস্তানেই আকমলের পাশে থেকে স্থায়ীভাবে ভবিষ্যৎ জীবন অতিবাহিত করতে বেশি আগ্রহী। অনলাইন গেমিংয়ের সাধারণ কিছু চ্যাট থেকে শুরু হওয়া এই সম্পর্ক আজ বাস্তবে এক পূর্ণাঙ্গ ও সুখী দাম্পত্যে রূপ নিয়েছে, যা প্রযুক্তি ও ভালোবাসার মেলবন্ধনে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
সূত্র: পাকিস্তান পয়েন্ট, এআরওয়াই নিউজ, হিন্দুস্তান টাইমস ও টাইমস অব করাচি।
